সিরিজ রিভিউ: পেট কাটা ষ – দেশীয় হরর ঘরানার নতুন মাত্রা
নুহাশ হুমায়ূন পরিচালিত চার পর্বের হরর সিরিজ “পেট কাটা ষ” বাংলা বিনোদন জগতে এক অসাধারণ সংযোজন। বাংলার চিরাচরিত লোককথার আদলে তৈরি এই সিরিজটি শুধু ভৌতিক অভিজ্ঞতা নয়, বরং সমসাময়িক সমাজ ও মানুষের মানসিক অবস্থা তুলে ধরেছে। প্রতিটি পর্বই এক একটি নতুন গল্প বলে যা আমাদের অতিপ্রাকৃত রহস্য এবং আধুনিক জীবনের জটিলতার মাঝখানে টেনে নিয়ে যায়।
সিরিজের চারটি পর্বেই বাংলা অঞ্চলের কয়েকটি ভৌতিক লোককাহিনীর
আধুনিক উপস্থাপন দেখা যায়। গল্পগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যেখানে প্রাচীন
কুসংস্কার এবং আধুনিক জীবনের দ্বন্দ্বকে চমৎকারভাবে মেলানো হয়েছে। আমাদের পরিচিত
ভৌতিক গল্পগুলোকে নতুন আঙ্গিকে দেখার সুযোগ এনে দিয়েছে এই সিরিজ।
প্রতিটি
পর্বে ব্যবহার করা হয়েছে অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি এবং মনোমুগ্ধকর ব্যাকগ্রাউন্ড
মিউজিক, যা
দর্শকদের সম্পূর্ণভাবে গল্পের সাথে জুড়ে রাখবে। ভৌতিক
পরিবেশ তৈরিতে বিশেষ করে আলোছায়ার ব্যবহার এবং কালার গ্রেডিং চমৎকারভাবে ফুটিয়ে
তুলেছেন নুহাশ হুমায়ুন।
এই সিরিজের
সবচেয়ে বড় শক্তি এর চরিত্রগুলো। প্রতিটি গল্পের কেন্দ্রিয় চরিত্রগুলো তাদের নিজ
নিজ ভূমিকা অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষ করে দ্বিতীয় পর্বে চঞ্চল চৌধুরী এবং
আফজাল হোসেনের অভিনয় ছিলো দুর্দান্ত। তাদের অভিনয় কেবল গল্পকে জীবন্তই করেনি,
বরং তা এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে।
এই ক্রেতার
পরিচয় সরাসরি উল্লেখ না করলেও তার আচরণ এবং মাহমুদের সাথে কথোপকথন স্পষ্ট করে যে, সে অন্য জগৎ থেকে এসেছে।
ক্রেতার চরিত্রটি দর্শকদের মনে কৌতূহল এবং ভয় উভয়ই
সৃষ্টি করবে। এই চরিত্রটি ইবলিশ শয়তানের প্রতীকী
উপস্থাপন, যার সঙ্গে কথোপকথনের প্রতিটি মুহূর্তেই মাহমুদ
একটি মানসিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যায়। ক্রেতা মাহমুদকে একটি ইচ্ছা পূরণের প্রস্তাব
দেয় যা মাহমুদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মাহমুদের ইচ্ছা ছিলো তার ভুলোমনাকে দূর করা, কারণ
এই সমস্যা তাকে প্রতিনিয়ত বিব্রত করে। ক্রেতাবেশী শয়তান তার
ইচ্ছা পূরণ করতে রাজি হয়, যখন মাহমুদের এই ইচ্ছা পূরণ হয়, তখন সে বুঝতে পারে, প্রাপ্তির আনন্দের চেয়েও বড়
কিছু হারিয়ে গেছে তার জীবন থেকে। মায়ের গর্ভে থাকা পর্যন্ত স্মৃতি মাহমুদের
মনে পড়ে যায়, যা একসময় তাকে মানসিক বিপর্যস্ত করে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয়।
এই পর্বে
চঞ্চল চৌধুরী ও আফজাল হোসেন দুজনই অসাধারণ অভিনয় করেছেন। আফজাল হোসেনের অভিনয় দর্শকদের মাঝে এক শীতল ভয়ের
অনুভূতি এনে দেবে। তার কথা বলার ভঙ্গি,
চাহনি এবং প্রতিটি দৃশ্যে থাকা আভিজাত্যের ছাপ পুরো চরিত্রটিকে
আরও ভয়ঙ্কর করে তোলে। মাহমুদের চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী ছিলেন একদম সাবলীল, যা দর্শকদের চরিত্রটির ভয় এবং দ্বিধা অনুভব করতে সাহায্য করবে।
“মিষ্টি
কিছু”
একটি গভীর, চিন্তা-উদ্রেককারী
গল্প। ইবলিশ শয়তানকে নিয়ে গল্পের গভীরতা এবং চরিত্রের মানসিক দ্বন্দ্ব এই পর্বকে
বিশেষ করে তুলেছে।
যারা রহস্য
ও ভৌতিক থিমে আগ্রহী এবং দেশীয় সংস্কৃতি ও লোককাহিনীর আধুনিক উপস্থাপনা দেখতে চান, তাদের জন্য এটি মাস্ট-ওয়াচ সিরিজ। এই সিরিজটি প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের নির্মাতা ও অভিনেতারা এখন
বিশ্বমানের গল্প বলার দক্ষতা অর্জন করেছেন।
“পেট
কাটা ষ” সিরিজটি কেবল ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং আমাদের চিন্তা-ভাবনাকে নতুন করে ঝালাই করার
জন্যও বটে। ২০২২ এ মুক্তিপ্রাপ্ত এই সিরিজ আমাদের দেশের বিনোদন জগতে নতুন এক দিক
উন্মোচন করেছিলো। নুহাশ হুমায়নের কাছ থেকে এরকম আরো
সিরিজ সিনেমা রিলিজ হবে সেই অপেক্ষায় রইলাম!

কোন মন্তব্য নেই