Header Ads

বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের আলাপ: একটি ভিন্নমত

বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবর্তন করা নিয়ে একটা আলাপ উঠেছে। যেহেতু এটা নিয়ে একটা আলোচনার সৃষ্ঠি হয়েছে,আসুন একটু পর্যালোচনা করে দেখি এই পরিবর্তনের আলাপের প্রয়োজনীয়তা বা অপ্রয়োজনীয়তা কিঃ 

জাতীয় সংগীত একটি জাতির পরিচয়ের প্রতীক এবং একটি জাতির মানুষের মধ্যে ঐক্যবোধ, দেশপ্রেম এবং জাতীয় চেতনা সৃষ্টিতে এই জাতীয় সংগীত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত "আমার সোনার বাংলা" রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত একটি অনন্য সৃষ্টি। এটি মুলত ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে হওয়া স্বদেশী আন্দোলনকে বেগবান করার উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিলো। এই গানের মাধ্যমে মূলত দুই বাংলার মানুষের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়েছিলো,যেটা ৪৭ পূর্ব সময় পর্যন্ত রাজনৈতিক ভাবে প্রাসঙ্গিক ছিলো। তবে, বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে এই গানটি কতটা প্রাসঙ্গিক তা নিয়ে কিছু প্রশ্ন উঠেছে এবং সেই প্রশ্ন যৌক্তিক না অযৌক্তিক তা বুঝতেই এই লেখার অবতারনা।

অনেকে এই জন্য বিরোধিতা করে যে "আমার সোনার বাংলা" গানটিতে কোথাও "বাংলাদেশ" শব্দটির উল্লেখ নেই। জাতীয় সংগীত পরিবর্তন করার জন্য এটি কোন যৌক্তিক কারন নয়। একটি দেশের জাতীয় সংগীতে সেই দেশের নাম থাকা আবশ্যক নয়, তবে এর মাধ্যমে সেই দেশের পরিচয়, চেতনা, এবং মানুষের সংগ্রাম ও আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হওয়াটা জরুরি।

"আমার সোনার বাংলা"একটি দেশত্ববোধক এবং আবেগময় গান, তবে এই গানটি একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছিল যা বর্তমান বাংলাদেশের জাতীয় সত্তা এবং পরিচয়কে সঠিকভাবে ধারণ করে বলে মনে করিনা। গানটি বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে, কিন্তু বর্তমানে নির্দিষ্ট হয়ে যাওয়া বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভূগোল, সংস্কৃতি, এবং জাতিগত বৈচিত্র্যকে প্রতিফলিত করে না। 

জাতীয় সংগীতের মূল উদ্দেশ্য হলো একটি দেশের পরিচয়কে বিশ্বব্যাপী তুলে ধরা এবং সেই দেশের নাগরিকদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধতা সৃষ্টির মাধ্যমে জাতীয়তাবোধকে জাগ্রত করা। উদাহরণ হিসেবে আমরা ভারতের জাতীয় সংগীতের দিকে তাকাতে পারি। "জন গন মন" রবীন্দ্রনাথের এই গানটি বর্তমান ভারত রাষ্ট্রকে সম্পুর্ন ভাবে প্রতিনিধিত্ব করে। "জন গন মন" তে ভারতের প্রাদেশিক এবং জাতীগত বৈচিত্রের বিষয়টা বেশ সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে কিন্তু "আমার সোনার বাংলা" গানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, সংগ্রাম, এবং স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয়ের কোন উল্লেখ নেই। এটি মূলত অখন্ড বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বর্ণনা করে, যা কোনো সন্দেহ ছাড়াই অত্যন্ত সুন্দর, কিন্তু এটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনগনের আত্মত্যাগ এবং সংগ্রামের ইতিহাসকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করে না। ফলে, জাতীয় সংগীত হিসেবে এর স্বতন্ত্রতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।


"আমার সোনার বাংলা" বাংলাদেশের আপামর জনগনের চিন্তা-চেতনা, স্বপ্ন এবং আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে না। আজকের বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র, যা তার নিজস্ব সংস্কৃতি, ভাষা, এবং সামাজিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে গঠিত। বর্তমান প্রজন্ম এমন একটি সংগীত চায় যা তাদের জীবনের সংগ্রাম, আশা, এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নকে ধারণ করবে, "আমার সোনার বাংলা" সেই প্রয়োজনীয় আকাঙ্ক্ষাগুলিকে পুরোপুরি পূরণ করতে সক্ষম নয় বলেই আমার ধারণা। 

তবে, জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত সংবেদনশীল একটা ব্যাপার। এই বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত আলোচনা এবং জনগণের মতামত গ্রহণ করা উচিত। 

সবশেষে বলতে চাই, "আমার সোনার বাংলা" আমাদের হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান ধরে রেখেছে এবং এটির ঐতিহাসিক মূল্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বর্তমানে একটি নতুন জাতীয় সংগীতের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আমাদের ভাবা উচিত যা বর্তমান বাংলাদেশের জাতীয় সত্তা, সংগ্রাম, এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশাকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করবে। একটি নতুন সংগীতই হয়তো আমাদের জাতিকে নতুন উদ্যমে ঐক্যবদ্ধ করতে এবং জাতীয় চেতনার বিকাশে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে।

কোন মন্তব্য নেই

luoman থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.