সিনেমালাপঃ 'দ্য কালার অফ প্যারাডাইস'
ইরানি চলচ্চিত্র পরিচালক মাজিদ মাজিদি পরিচালিত 'দ্য কালার অফ প্যারাডাইস' দেখলাম। সত্যি বলতে এটি অনেকদিন পর আমার দেখা কোন হৃদয়স্পর্শী সিনেমা। সাধারণত মনে দাগ কেটে যায় এই ধরনের সিনেমা নিয়ে সব সময়ই দু এক লাইন লিখি, সেই ভাবনামতই কালার অফ প্যারাডাইস নিয়ে দর্শন পরবর্তি অনুভূতি লিখে রাখছি।
অনেক দিন পর কোন ইরানি সিনেমা দেখলাম। এটিকে নিছক একটি সিনেমা বললে ভুল হবে, এখানে একাধারে মানবিক আবেগ, আধ্যাত্মিকতা এবং প্রকৃতির সৌন্দর্যকে একত্রিত করে একটি হৃদয়গ্রাহী গল্প পোট্রেট করা হয়েছে। এটি কেবল এক অন্ধ শিশুর সংগ্রামের কাহিনি নয়, বরং দ্বিধায় থাকা এক অসহায় পিতা এবং অন্ধদের প্রতি বাকি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মাঝে তুলে ধরেছে। অন্ধরা কিভাবে নিজেদের আলাদা জগৎ সৃষ্ঠি করে প্রকৃতির ভাষার মধ্যে এক সংবেদনশীল সংযোগ তৈরি করে তা মাজিদ মাজিদি এই সিনেমায় বেশ সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।![]() |
| মোহাম্মদ আর তার দাদি |
‘দ্য কালার অফ প্যারাডাইস’ একজন অন্ধ শিশু, মোহাম্মদের জীবন সংগ্রামের গল্প তুলে ধরেছে। তেহরানের এক অন্ধ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে মোহাম্মদ, কিন্তু গ্রীষ্মের ছুটিতে তাকে গ্রামে, পরিবারের কাছে ফিরে যেতে হয়। তবে তার বিপত্নীক বাবা মনে করে যে তার ছেলের অন্ধত্ব তার ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য বোঝা। মোহাম্মদের বাবা একজন বাস্তববাদী ও আত্মকেন্দ্রিক মানুষ, সিনেমায় দেখতে পাই সে নিজের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তার অন্ধ ছেলেকে বোঝা মনে করে। তাই সে মোহাম্মদকে এক অন্ধ কারিগরের কাছে শিক্ষানবিশ হিসেবে পাঠিয়ে দিতে চায়।
অন্যদিকে, মোহাম্মদ একজন সংবেদনশীল ও মেধাবী শিশু। ও প্রকৃতির শব্দের মধ্যে এক গভীর সৌন্দর্য খুঁজে পায়। মোহাম্মদ তার হাত দিয়ে ধরে সবকিছু অনুভব করতে চায়, সে পাখির ডাক শুনে আনন্দ পায়। সে যেন এক নতুন দৃষ্টির মাধ্যমে এই পৃথিবীকে দেখতে পায় বা দেখার চেষ্টা করে, কিন্তু তার বাবা একরকম সমাজের চাপ ও নিজের স্বার্থপরতার কারণে ছেলেটিকে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। এই সিনেমা মূলত বাবা-ছেলের সম্পর্ক, আত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রকৃতি ও মানবতার সৌন্দর্য তুলে ধরেছে। সিনেমায় মোহাম্মদের চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছে মোহসেন রামেজানি। মোহাম্মদের বাবার ভূমিকায় ছিলো হোসেন মাহজুব।
অন্যদিকে, মোহাম্মদ একজন সংবেদনশীল ও মেধাবী শিশু। ও প্রকৃতির শব্দের মধ্যে এক গভীর সৌন্দর্য খুঁজে পায়। মোহাম্মদ তার হাত দিয়ে ধরে সবকিছু অনুভব করতে চায়, সে পাখির ডাক শুনে আনন্দ পায়। সে যেন এক নতুন দৃষ্টির মাধ্যমে এই পৃথিবীকে দেখতে পায় বা দেখার চেষ্টা করে, কিন্তু তার বাবা একরকম সমাজের চাপ ও নিজের স্বার্থপরতার কারণে ছেলেটিকে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। এই সিনেমা মূলত বাবা-ছেলের সম্পর্ক, আত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রকৃতি ও মানবতার সৌন্দর্য তুলে ধরেছে। সিনেমায় মোহাম্মদের চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছে মোহসেন রামেজানি। মোহাম্মদের বাবার ভূমিকায় ছিলো হোসেন মাহজুব।
এই সিনেমাটি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটা বিষয় নিয়ে অবশ্যই বলা উচিত, আর তা হলো প্রকৃতির সঙ্গে মোহাম্মদের গভীর সংযোগ। মোহাম্মদের চারপাশের প্রতিটি স্পর্শ, বাতাসের সুর, পাখির ডাক এবং গাছের পাতা তার কাছে একটি নতুন ভাষার মতো মনে হয়। এখানে পরিচালক মাজিদ মাজিদি প্রকৃতির সৌন্দর্যকে ব্যবহার করেছেন এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ভাষা হিসেবে। প্রকৃতি মোহাম্মদের কাছে একমাত্র মাধ্যম, যা তাকে সত্যিকারের মুক্তির অনুভূতি দেয়। এটি যেন ঈশ্বরের সঙ্গে তার যোগাযোগের একটি উপায়।
এই সিনেমার কিছু কিছু দৃশ্য আছে যা দেখার পর নিজের অজান্তেই চোখ কিরকম ভিজে উঠেছিলো। দুই একটা দৃশ্যের কথা বলা যায়; সিনেমার শুরুর দিকে যখন মোহাম্মদের বাবা মোহাম্মদকে হোস্টেল থেকে বাড়িতে নিতে আসেন,তখন মোহাম্মদ তার বাবার প্রতি কান্না জড়ানো কণ্ঠে বলে ওঠে, "আমি ভেবেছিলাম তুমি কখনো আমাকে নিতে আসবে না," এই দৃশ্যটির সংলাপ উপস্থাপণ এতটাই মর্মস্পর্শী ছিলো যে দেখতে দেখতেই চোখ ছলছল করে ওঠে। আবার যখন মোহাম্মদ অন্ধ ছুতার মিস্ত্রির কাছে প্রশ্ন করে "ঈশ্বর যদি আমাকে ভালোবাসেন তবে কেন তিনি আমাকে অন্ধ বানালেন?" তখন সেই প্রশ্ন যেন প্রত্যেক দর্শকের হৃদয়কেও আন্দোলিত করে। এই সংলাপ শুধু একটি শিশুর কৌতূহল নয়, বরং ঈশ্বর ও মানবতার সম্পর্ক নিয়ে এক দার্শনিক প্রশ্নও উত্থাপন করে।
![]() |
| মোহাম্মদ আর তার বোন |
"দ্য কালার অফ প্যারাডাইস" মানবতা, পিতৃত্ব, ঈশ্বরবিশ্বাস এবং প্রকৃতির সঙ্গে এক অন্তর্নিহিত সম্পর্কের প্রতিফলন। এটি আমাদের শেখায় যে অন্ধত্ব কেবল শারীরিক প্রতিবন্ধীতাই নয়, বরং মনেরও অন্ধত্ব হতে পারে। আমার বিশ্বাস, এই সিনেমাটি দেখার পর যেকোনো দর্শকদের মনে দীর্ঘসময় ধরে এর প্রভাব থাকবে। শেষে এটুকু বলতে পারি, 'দ্য কালার অফ প্যারাডাইস' আমাদের জীবন ও জীবনের প্রতি বিশ্বাস নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে অনুপ্রাণিত করবে।



কোন মন্তব্য নেই