সাধারণ এক সিনেমাপ্রেমীর দৃষ্টিতে কিয়ারোস্তামির ক্লোজআপ এন্ড থ্রু দ্যা অলিভ ট্রিস
১৯৯০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত "ক্লোজ আপ" এবং ১৯৯৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত "থ্রু দ্য অলিভ ট্রি'স" ইরানি পরিচালক আব্বাস কিয়ারোস্তামির পরিচালিত দুটি অসাধারণ চলচ্চিত্র। এই দুই সিনেমারই গল্প বলার ধরন অন্য আর পাঁচটা সিনেমার থেকে আলাদা, এই দুটিতেই মানুষের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বিভিন্ন ঘটনায় কিরকম প্রতিক্রিয়া দেয় তার উপর একটি সাম্যক দৃষ্টিভঙ্গি দর্শকদেরকে প্রদান করে। এই দুটি সিনেমাই ইরানের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত সমাজের সংস্কৃতি, তাদের দৈনন্দিন জীবনের সুখ দুঃখ এবং আশা আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নির্মিত। বিশেষ করে "ক্লোজ আপ" সম্পুর্নই সত্যি ঘটনা অবলম্বনে। "ক্লোজ আপ" এবং "থ্রু দ্য অলিভ ট্রি'সে" আব্বাস কিয়ারোস্তামির বিস্ময়কর পরিচালন এবং ক্যামেরা চালানোর দক্ষতায় সাধারণ দৃশ্যও যেন অনেক চমৎকার রুপে আমাদের কাছে ধরা দেয়।
"ক্লোজ আপে" কিয়ারোস্তামি একটি সম্পুর্ন বাস্তব ঘটনা রিক্যাপচারের মাধ্যমে ফিকশন এবং বাস্তবতার মধ্যকার সীমারেখাটি আমাদের দর্শকদের মাঝে অস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। সিনেমাটি এমন একজন ব্যক্তিকে নিয়ে যিনি ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা মোহসেন মাখমালবাফের পরিচয় নিয়ে আহানখা পরিবারে প্রবেশ করে এবং তাদেরকে বলে," তার পরবর্তী সিনেমায় আহানখা পরিবারের সদস্যদের দিয়ে অভিনয় করাবে। যদিও তার এই জাল পরিচয় পরবর্তীতে ফাঁস হয়ে যায় এবং তাকে প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তারও করা হয়।
আগেই বলেছি ক্লোজআপ সম্পুর্ন সত্যি ঘটনা অবলম্বনে এবং এই সিনেমার সব কলাকুশলীরাও রিয়েল লাইফ ক্যারেক্টর।ডকুমেন্টারি-স্টাইলে সিনেমার প্রত্যেক চরিত্রের সাক্ষাত্কার এবং সিনেমায় দেখানোর জন্য কিছু সত্যি ঘটনার দৃশ্য পুর্ননির্মান এবং দৃশ্যগুলি সিকুয়েন্স অনুযায়ী পুনর্বিন্যাসের সমন্বয়ে কিয়ারোস্তামি আমাদের উপহার দেয় তার জীবনের অন্যতম সেরা কাজ "ক্লোজ আপ "। এই সিনেমাটি প্রথমবার দেখতে নিলে ধীরে ধীরে দর্শকদের মাঝে একটি ধাঁধার মত উন্মোচিত হবে। কিয়ারোস্তামির মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং চৌকস ক্যামেরাওয়ার্ক দর্শকদেরকে চরিত্রগুলির বিশেষ করে প্রধান চরিত্র হোসেন সাবজিয়ানের মানসিক অবস্থার দিকে আকৃষ্ট করবে, যার ফলে দর্শকদের সাবজিয়ানের প্রতি এক গভীর সহানুভূতি প্রকাশ পাবে।
অন্যদিকে,"থ্রু দ্য অলিভ ট্রি'সও " এক সিনেমা বানানোর গল্পের থিমের উপর তৈরী। এখানে দেখতে পাই হোসেন রেজাই নামক এক গ্রাম্য যুবক তার থেকে তুলনামূলক ধনী সমাজের মেয়ে তাহেরেহকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, এদিকে তাহেরেহ ভূমিকম্পে তার বাবা মাকে হারিয়ে বর্তমানে তার দাদির সাথে থাকে। যেহেতু হোসেন তাহেরেহর থেকে দরিদ্র এবং অশিক্ষিত, মেয়েটির দাদি তার প্রস্তাবকে নাকচ করে দেয়। ফলস্বরুপ তাহেরেহেও হোসেনকে এড়িয়ে চলা শুরু করে। এমনকি হোসেন আর তাহেরেহ যখন ঘটনাক্রমে সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পায় তখনো শুটিং এর সময় সিনেমার ডায়ালগ বাদে তাহেরেহ হোসেনের অন্য কোন কথার জবাব দেয়নি। হোসেন বারবার বিয়ে সম্পর্কে জানতে চাইলেও তাহেরেহ চুপ করে থাকতো এবং এভাবেই সিনেমার কাহিনী এগিয়ে চলে।
যদিও "ক্লোজ আপ" এবং "থ্রু দ্য অলিভ ট্রি'স" দুটি ভিন্ন জনরার সিনেমা তারপরও কোথায় যেন এই দুইয়ের ভিতর একটা সুক্ষ্ণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এই দুই সিনেমাতেই সাধারণ রিয়েল লাইফ ক্যারেক্টর ব্যবহার করায় অভিনয় খুব সাবলীল লেগেছে। এই দুই সিনেমাতেই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সুখ দুঃখ, আশা আকাঙ্ক্ষার মত বিষয়গুলিকে কিয়ারোস্তামি তার অতুলনীয় দক্ষতায় ক্যাপচার করে আমাদের মাঝে প্রদর্শন করেছেন।


কোন মন্তব্য নেই