মৃণাল সেনের কলকাতা ত্রয়ী (এক চলচ্চিত্রকারের চোখে ৭০ এর দশকের কলকাতা)
কলকাতা ত্রয়ীকে মৃণাল সেনের জীবদ্দশার অন্যতম সেরা এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে করা হয় এবং এই ত্রয়ীকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি ল্যান্ডমার্ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই তিনটি সিনেমা সত্তরের দশকে ভারতের বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গেের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার সময়ে তৈরি করা হয়েছিল। যার দরুন এই সিনেমাগুলিতে তখনকার সময়ের দারিদ্র্য,দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য এবং মধ্যবিত্ত জীবনের আশা আঙ্খাকার নিখুঁত চিত্রায়ণ সম্ভব হয়েছিলো।
ইন্টারভিউ (১৯৭১), কলকাতা ৭১(১৯৭২), এবং পদাতিক (১৯৭৩) এই তিনটি চলচ্চিত্রকে একত্রে মৃণাল সেনের কলকাতা ত্রয়ী বলে আখ্যা দেওয়া হয়।ত্রয়ীর প্রথম সিনেমা "ইন্টারভিউ"। ইন্টারভিউতে একজন যুবকের গল্প বলা হয়েছে,যেই যুবক কলকাতার একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য,লেখাপড়া শেষ করে চাকরির সন্ধানে ঘুরছে। একদিন সে তার এক আত্মীয়ের সৌজন্যে চাকরি পেয়েও যায় কিন্তু চাকরির ইন্টারভিউর জন্য তার কোট,প্যান্ট প্রয়োজন। সেই মতো ঐ যুবক একজোড়া কোট প্যান্ট জোগাড়ও করে ফেলে কিন্তু ভাগ্য বিড়ম্বনায় সে ইন্টারভিউ তে ঐ কোট প্যান্ট পরে যেতে পারেনি, এবং বাধ্য হয়ে ঐতিহ্যবাহী ধুতি পাঞ্জাবী পরে যায় যার, ফলে সমস্থ মেধা এবং যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র ইন্টারভিউ বোর্ডে তথাকথিত ফরমাল গেট আপে থাকতে না পারার কারনে তার চাকরি হয়না।
সিনেমাটি ভারতীয় চাকরির বাজার এবং আমলাতন্ত্র ব্যবস্থার একটি কঠোর সমালোচক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলো। বেকার তরুন যুবকদের সমাজে একটুখানি প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য যেই সংগ্রামের ভিতর দিয়ে যেতে হয়,এই সিনেমায় সেই সংগ্রামকে সার্থক ভাবে চিত্রায়িত করেছিলেন মৃণাল সেন।
ত্রয়ীর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র "কলকাতা ৭১", চলচ্চিত্রটিকে কলকাতা নগরী কেন্দ্রীক চারটি ভিন্ন সময়ের চারটি ছোট গল্পের সংকলন বললে অত্যুক্তি হবেনা, এবং এই চারটি গল্পের মূল বিষয়বস্তু একে অপরের সাথে পরস্পরসংযুক্ত।
সিনেমাটিতে সামাজিক অসমতা, বৈষম্য, দারিদ্র্য এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির বিষয়গুলো বেশ বাস্তবসম্মত ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিলো।এই চলচ্চিত্রটিতে বিভিন্ন শ্রেণী বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত সমাজের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে চিত্রায়িত করা হয়েছে।
সত্তরের দশকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় কলকাতা নগরীর নাগরিক জীবনের জটিলতার সূক্ষ্ম চিত্রায়নের জন্য ছবিটি চলচ্চিত্র সমালোচকদের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছিল। একক ভাবে ধরলে এটি মৃণাল সেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত হয় এবং প্রায়শই এটিকে ভারতীয় "নিউ ওয়েভ সিনেমা আন্দোলনের" উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়।
সিনেমাটিতে সামাজিক অসমতা, বৈষম্য, দারিদ্র্য এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির বিষয়গুলো বেশ বাস্তবসম্মত ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিলো।এই চলচ্চিত্রটিতে বিভিন্ন শ্রেণী বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত সমাজের বেঁচে থাকার সংগ্রামকে চিত্রায়িত করা হয়েছে।
সত্তরের দশকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় কলকাতা নগরীর নাগরিক জীবনের জটিলতার সূক্ষ্ম চিত্রায়নের জন্য ছবিটি চলচ্চিত্র সমালোচকদের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছিল। একক ভাবে ধরলে এটি মৃণাল সেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত হয় এবং প্রায়শই এটিকে ভারতীয় "নিউ ওয়েভ সিনেমা আন্দোলনের" উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়।
মৃণাল সেনের কলকাতা ত্রয়ীর সর্বশেষ সিনেমা "পদাতিক"। একজন নকশাল বিপ্লবী এর গল্প অবলম্বনে চলচ্চিত্রটি নির্মিত। সিনেমার শুরুর দিকে দেখা যায় পুলিশের তারা খেয়ে এক নকশাল বিপ্লবী এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পালিয়ে বেড়াচ্ছে। পরবর্তীতে দেখতে পাই, ঐ বিপ্লবী যুবক দলের হাইকমান্ডের পরামর্শে নাম পরিচয় গোপন রেখে এক ডিভোর্সি মহিলার মালিকানাধীন একটি অ্যাপার্টমেন্টে আশ্রয় নেয়। এখানে দেখা যায় দুজনেই বিদ্রোহী: একজন রাজনৈতিক ভাবে এবং অন্যজন সামাজিক স্তরে। উভয়ই তাদের জীবনের খারাপ অভিজ্ঞতা সমন্ধে ক্লান্ত বিরক্ত। একটি ফ্লাটে মাসের পর মাস নির্জন নির্বাসনে থাকার কারনে বিপ্লবী যুবক নিজের আত্ম-সমালোচনা করে এবং তার হাইকমান্ড নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে যে তাদের সব সিদ্ধান্ত ঠিক ছিলো কিনা! কিন্তু হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করা অনুমোদিত ছিলো না,উচ্চতর নেতৃত্ব যা সিদ্ধান্ত নেবে তা মান্য করা ছিলো বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই মান্য না করা থেকেই দলের নেতৃত্বের প্রতি জন্মায় অসন্তুষ্টি,অসন্তুষ্টি থেকে তিক্ততা এবং সর্বশেষ তিক্ততা থেকে পার্টির নেতৃত্বের সাথে সম্পূর্ণ ভাবে সম্পর্কের বিচ্ছেদ হয় ঐ বিপ্লবী যুবকের।
কিন্তু সংগ্রাম চলতে থাকে রাজনৈতিকভাবে নির্বাসিত ঐ বিপ্লবীর এবং পরিবার থেকে নির্বাসিত ঐ ডিভোর্সি নারীর উভয়েরই।
চলচ্চিত্রটিতে মুলত রাজনৈতিক সংগ্রাম, মোহভঙ্গ এবং ব্যক্তিগত আত্মত্যাগের বিষয়গুলো বেশ বাস্তবসম্মত ভাবে রুপায়ন করা হয়েছে।
১৯৭০ এর দশকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি কলকাতার বিভিন্ন সামাজিক সমস্যাগুলিও বেশ করুনভাবে এই চলচ্চিত্রটিতে ফুটে উঠেছে।
সর্বোপরি মৃণাল সেনের কলকাতা ত্রয়ী হল ১৯৭০ এর দশকের গোড়ার দিকে ভারতীয় তথা পশ্চিমবঙ্গের সমাজ ও রাজনৈতিক দর্শনের একটি শক্তিশালী ভাষ্য এবং প্রামাণ্যচিত্র। শুধু ৭০ এর দশকের প্রামাণ্যচিত্র বললে ভুল হবে কারন যে সমস্যাগুলো ঐ সিনেমাগুলোতে চিত্রায়িত হয়েছে তা বর্তমান সময়েও সমান ভাবে প্রাসঙ্গিক।
এই তিনটি চলচ্চিত্রই তাদের সামাজিক বাস্তবতা, অপ্রচলিত গল্প বলার ধরন এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তার জন্য বিখ্যাত। এবং এগুলি আজও এবং মনে করি ভবিষ্যতেও চলচ্চিত্র পণ্ডিত এবং সমালোচকদের দ্বারা অধ্যয়ন ও আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে রয়ে যাবে।
কোন মন্তব্য নেই