Header Ads

জিন-এম জে বাবু (পাঠ প্রতিক্রিয়া)

এ যেন "শেষ হয়ে হইলো না শেষ"এত টান টান গতিশীল একটি কাহিনী কিন্তু শেষের দিকে বইয়ে বর্নিত মূল রহস্যের উন্মোচনই হলো না। রহস্যের সামান্য কিছু আভাস মাত্র দেওয়া আছে। তাই ঐ বিষয়টি জানার জন্য বইটি পড়া শেষ হতেই কেমন উশখুশ করছে মন। হয়তো এটিও এক প্রকার মার্কেটিং স্ট্রাটেজি,স্যিকুয়েলের বাজার ধরে রাখার জন্য।

সাহিত্যের শ্রেণিবিভাগে " জিন" বইটি অকাল্ট থ্রিলার জনরার। বর্তমানে ভৌতিক অতিপ্রাকৃত বিষয়ক উপন্যাস মানেই এই অকাল্ট থ্রিলার,যেখানে তন্ত্র,মন্ত্র,ঝাড়ফুক,কালো জাদু,প্রেত চর্চা ইত্যাদি মূখ্য বিষয়। "জিন" বইটিও এই ধরনের অতিপ্রাকৃত উপাদানে সমৃদ্ধ।তবে অনন্য হরর বইয়ের থেকে এই বইয়ের পার্থক্য হলো এটি সম্পুর্ন ইসলামিক দৃষ্টিকোন থেকে অনেক ডিটেইলস তথ্য,রেফারেন্স দিয়ে লেখা। জিনের কাহিনী নিয়ে লেখা হরর গল্প বাংলা সাহিত্যে খুব একটা বেশি হয়নি,সেই দিক দিয়ে দেখলে এম জে বাবু ভাইয়ের "জিন" বইটি বাংলা হরর সাহিত্যের এক অনন্য সংযোজন।

বইয়ে বর্নিত কিছু বর্ননা এতটা আকর্ষনীয় লেগেছে যে মনে হয়েছে দেশিও প্লটে আমি কোন হলিউড সিনেমা দেখছি,অথবা বলা যেতে পারে এই বর্ননাগুলো মনে হয় তুর্কি হরর মুভি সিরিজ সিজ্জিনের কোন দৃশ্য। আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি এত ভয়াল বর্ননা বাংলার অন্য কোন হরর বইতে নেই। রাতে এই বই পড়ার পর কেমন একটা গা ছমছম এবং অন্ধকারে একটা অস্বস্তিবোধ ভিতরে কাজ করতো,হয়তো একজন মুসলিম হিসাবে জিনের অস্তিত্বে বিশ্বাস করার কারনেই বইয়ে বর্নিত কাহিনীর সাথে অজান্তেই আপন সত্ত্বা রিলেট হয়ে যেত যার দরুন এই ভয়ের উদ্রেক।


সাধারণত অনন্য অকাল্ট থ্রিলার বা হরর বই কাল্পনিক কাহিনী নিয়েই লেখা, এবং আমরা ধরেই নেই এগুলো বাস্তবে কখনোই সম্ভব না। "জিন" বইয়ের কাহিনীও কাল্পনিক কিন্তু এক্ষেত্রে একজন মুসলিম হিসেবে বইয়ে বর্নিত ঘটনা কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবেনা। কারন এই ঘটনাগুলো বাস্তবে ঘটতে পারে বলে আমাদের বিশ্বাস এবং পূর্বেও এই ধরনের ঘটনা আমাদের সমাজে ঘটেছে বলে আমরা মনে করি।
আর যদি আপনি অমুসলিম বা অবিশ্বাসী হন তাহলে হয়তো পূর্বের লাইনে উল্লেখিত আমার কথাগুলো আপনার বিরক্তির কারন হতে পারে,সেক্ষেত্রে আমি আপনাকে বলবো আপনি শুধু এই বইটিকে অনন্য হরর অকাল্টের মতোই ট্রিট করুন,আমি আপনাকে এটুকু বলতে পারি,বইটি খারাপ লাগবে না,আপনি ভয় পাবেনই এবং ভয়াল রস উপভোগ করবেন।

আগেই বলেছি এই বইটি বিস্তর তথ্যে ভরপুর। লেখক এম জে বাবু ভাই যে অনেক গবেষণা করে এই বইটি লিখেছেন তা বইয়ের পাতায় পাতায় স্পষ্ট। "জিন" মুলত ফিকশন ও নন-ফিকশনের সংকর। অনেক নতুন বিষয়ে জানতে পেরেছি এই বইটির মাধ্যমে, জিন জাতির ইতিহাস,কালো জাদু করার ইতিহাস, কালো জাদু কিভাবে করে,জাদুর প্রভাবে কিভাবে মানুষ অসুস্থ হয়,এর প্রতিকার ইত্যাদি নানা বিষয়ে বেশ বিস্তারিত ভাবে রেফারেন্স সহ বর্ননা করা আছে,কিছু কিছু নতুন শব্দও জেনেছি এই বইটি পড়ে যেমন: জাদুকরের আরেক প্রতিশব্দ সাহির, কালোজাদুর প্রতিশব্দ সিহর। ফেরেশতার প্রতিশব্দ মালাইকা আবার জিনের বিভিন্ন জাতির নাম যেমন: মারিদ, ইফ্রিত এরা কিভাবে মানুষের ক্ষতি করে এদের প্রতিকারের উপায় ইত্যাদি।

এবার একটু কাহিনী আর চরিত্রের দিকে তাকাই,প্লট চমৎকার তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিছু বাড়তি ঘড়োয়া বর্ননা বাদে বইয়ের প্লট শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠককে ধরে রাখবে। সাজেদ,তারিনদের কাহিনি এবং হাফেজ মিয়া, ইমরানের কাহিনী বইয়ে প্যারালালভাবে এগিয়েছে,শেষের দিকে এই দুই কাহিনি এক লাইনে এসে নাটকীয়ভাবে মিলিত হয়েছে।
বইয়ে বর্নিত চরিত্ররা অধিকাংশই শুরুতে অলৌকিকতায় অবিশ্বাসী ছিলো। বইয়ের অন্যতম প্রধান দুই চরিত্র, সাজেদ আর রফিককে স্বার্থপর এবং ধূর্ত হিসেবে তুলে ধরেছেন লেখক,তাদের পাপ কার্যই মূলত তাদের অশান্তির কারন। যদিও শেষে তাদের চেতনাদোয় হয়।
আসলান চরিত্রটিকে চমৎকার লেগেছে আমার,শুরুতে সংশয়বাদী থাকলেও পড়ে সে বিশ্বাসী হয়।
তারিন চরিত্রটিকে নিয়েই সব গন্ডগোল,তাকে নিয়ে যেসব ভয়াল বর্ননা লেখক দিয়েছেন সেগুলো শুধুমাত্র হলিউডের সিনেমাতেই দেখা যায়।
জাফর,এই বইয়ের নায়ক চরিত্র বলা যেতে পারে। আমার কাছে জাফরকে একজন অতিমানব বলে মনে হয়েছে,লেখক জিন,কালোজাদু সমন্ধে যেসব তথ্য দিয়েছে তা আসলে জাফরের ভাষ্যেই দিয়েছে। জাফর গড়গড় করে সব কিছু বলে দিচ্ছে এই বিষয়টি আমার কাছে কিরকম রোবটের মত লেগেছে, একজন সাধারণ মানুষের এত এত রেফারেন্স সহ তথ্য কিভাবে মুখস্থ থাকতে পারে এটা আমার ঠিক মাথায় আসেনা।
জনু কবিরাজ নামক এক মানবরুপী শয়তান এই বইয়ের ভিলেন চরিত্র।
আর ছোট্ট মাহা। সারা বই জুরে মাহার কার্যক্রম শুধুমাত্র আকার ইঙ্গিত দিয়েই সেরেছে লেখক,কিছু কিছু অলৌকিক ঘটনা মাহাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে বটে যা একটা বড় রহস্যের ইঙ্গিত দিচ্ছিলো,ভেবেছিলাম বইয়ের শেষে এই রহস্যের জট লেখক খুলে দেবে,কিন্তু মাহার অপ্রত্যাশিত শেষ টুইস্টটি এই রহস্য আরো বাড়িয়ে দিয়েই কাহিনীর যবনিকা পতন ঘটায়।
শেষে শুধু বলতে চাই যারা হরর অকাল্ট প্রেমি তাদের অবশ্যই এই বইটি পড়া উচিত। এই এক বইয়ের মাধ্যমে অনেক অজানা জ্ঞানের জগৎ থেকে পাঠক ঘুরে আসবে। এই বইয়ের কাহিনী নিয়ে সিনেমা ওয়েব সিরিজ হলে তা অবশ্যই দর্শক নন্দিত হবে। আর হ্যা সাসপেন্স ধরে রাখতে পারছিনা,তাই অধির আগ্রহে জিন-২ এর অপেক্ষায় রইলাম।

কোন মন্তব্য নেই

luoman থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.