সুনীলের সময় ত্রয়ীর প্রথম আখ্যান "সেই সময়"
কবি এবং কথা সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমার একজন প্রিয় লেখক।এর আগে তাঁর কিছু কাব্যগ্রন্থ,গল্প এবং কাকাবাবুর বই গুলো পড়েছি যা সবই সুখপাঠ্য ছিল।“সেই সময়”বইটি যখন পড়তে নিলাম তখন এর আকার দেখে খানিকটা দ্বিধায় ছিলাম যে শেষ পর্যন্ত এটি ধৈর্য্য সহকারে শেষ করতে পারবো কিনা,কারন এত বৃহৎ আকারের উপন্যাস এর আগে কখনো পড়েনি। কিন্তু বইটি শুরু করার পর সেই আশংকা আর সত্যি হয়নি,প্রায় সাতশ পৃষ্ঠার গ্রন্থটি পাঁচদিন ধরে পড়েছি,যতক্ষন উপন্যাসের মধ্যে ছিলাম মনে হয়েছে একটা ঘোরের মধ্যে আছি,পড়ার সময় কোন ক্লান্তি নেই,অবকাশ নেই এমনই আকর্ষনীয়,প্রানবন্ত গতিশীল ভাষা।
উপন্যাসের মূল চরিত্র জমিদারপূত্র নবীনকুমার।তাঁর জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি এই উপন্যাসের পরিধি।এখানে বলা প্রয়োজন যে নবীনকুমার চরিত্রটি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ঐতিহাসিক চরিত্র কালীপ্রসন্ন সিংহ অবলম্বনে তৈরী করেছেন। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যলগ্নের কলকাতা এই উপন্যাসের পটভূমিকা।লেখক তৎকালীন সময়ের সামাজিক সমস্যাগুলো খুব করুন ভাবে এই উপন্যাসে তুলে ধরেছেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ আন্দোলন,দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচার,মধুসূদন দত্তের ইংরেজ প্রীতি এবং পরবর্তীতে বাংলাভাষায় সাহিত্যচর্চা,সিপাহী বিপ্লব,নীলকরদের অত্যাচার এবং কৃষকদের সম্মিলিত প্রতিরোধ,ধনিক শ্রেনীর সমাজ সেবামূলক কার্যক্রমের আড়ালে তাঁদের বিলাসী জীবন যাপন,মদ্যপান,পরদার গমন ইত্যাদি নানারকম বিষয়াদিকে সমন্বয় করে সময়ের ধারাবাহিকতায় নির্মিত এই বৃহৎ পরিসরের উপন্যাস।
এই উপন্যাসের প্রায় সব চরিত্রই ঐতিহাসিক কিন্তু কাহিনীতে গতিশীলতা আনয়নের জন্য গ্রন্থাকারকে কিছু কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছে যাতে মূল ঘটনার বা চরিত্রের একটুও অবক্ষয় হয়নি বরং চরিত্রগুলো এতে করে আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছে।এই প্রসঙ্গে গ্রন্থাকারের বক্তব্য হলোঃ উপন্যাস উপন্যাসই, ইতিহাস নয়, বলাই বাহুল্য।ইতিহাসের সার্থকতা তথ্যনিষ্ঠায় উপন্যাসের উপজীব্য হলো তত্ত্ব এবং শিল্পরস। উপন্যাসের চরিত্রগুলি কথা বলে এবং ঘুরে ফিরে বেড়ায়,কিন্তু ইতিহাস সংলাপের ধার ধারে না,এবং জীবনীগ্রন্থগুলিতেও দু-চারটি টুকরো গল্প ছাড়া জীবিত মানুষটির কীর্তিগুলির আক্ষরিক বর্ণনা থাকে না। সুতরাং যতদূর সম্ভব তথ্য আহরণ করে এদের জীবন্ত করার জন্য কল্পনাশ্রয়ী সংলাপ বহুল পরিমাণে ব্যবহার করতে আমি বাধ্য হয়েছি।কারো কারো মনে হতে পারে এটা লেখকের পক্ষে বেশি স্বাধীনতা গ্রহণ,কিন্তু আমি মনে করি, লেখকের স্বাধীনতার সীমানা টানা উচিত নয়।কারন,পাঠকের স্বাধীনতা প্রকৃত পক্ষেই সীমাহীন।তবে,কোন ঐতিহাসিক চরিত্রকেই আমি স্বস্থান থেকে কিংবা জীবনপর্বের নির্দিষ্ট সময়গুলি থেকে বিচ্যুত করিনি।
পরিশেষে বলতে চাই ইতিহাস অনুসন্ধানী পাঠকদের কাছে এই গ্রন্থটি একটি বহুমূল্যবান দলিলের মত।একবার পড়তে শুরু করলে আর শেষ করতে ইচ্ছা করবে না।
ব্যক্তিগত রেটিংঃ ১০/১০

কোন মন্তব্য নেই